বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় নতুন আইনি কাঠামো: সময়োপযোগী সংশোধন, বিস্তৃত সুরক্ষা ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ
“বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৫”
বিষয়ক “বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় নতুন আইনি কাঠামো: সময়োপযোগী সংশোধন, বিস্তৃত
সুরক্ষা ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ।”
লেখকঃ
আইন বিশ্লেষক জনাব
আবদুর রব পারভেজ রবি,
আইনজীবী, বাংলাদেশ
সুপ্রীম কোর্ট।
ভূমিকাঃ
রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন হলো ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনস্বার্থ
রক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অর্থনৈতিক
অবকাঠামোর বিবর্তন এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট—সবই পুরোনো আইনের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে
সামনে এনেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বহু আইন এখনও ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীল,
যা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে সময়োপযোগী, বাস্তবায়নমুখী
এবং নাগরিক–বান্ধব আইনি সংশোধন আজ একান্ত প্রয়োজনীয়। বিচার ব্যবস্থার গতি বৃদ্ধি, পেন্ডিং
মামলার সংখ্যা হ্রাস এবং ন্যায়বিচারে স্বচ্ছতা এসবই হালনাগাদ আইনের উপর নির্ভরশীল।
![]() |
| বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় নতুন আইনি কাঠামো: সময়োপযোগী সংশোধন, বিস্তৃত সুরক্ষা ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ। |
বন সংরক্ষণে প্রায় শতবর্ষ পুরোনো আইনের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে বন সংরক্ষণের মূল ভিত্তি ছিল The
Forest Act, 1927—যা ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে প্রণীত এবং বর্তমান পরিবেশগত বাস্তবতায়
অনেকাংশে অপ্রতুল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়নের চাপ, অবৈধ দখল, বনভূমি উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক
বনাঞ্চলে চাপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব সামলাতে নতুন কাঠামোর প্রয়োজন
ছিল। সেই প্রয়োজন মেটাতেই প্রণীত হয়েছে “বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৫”।
নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও সংশোধনের উদ্দেশ্য
বন্যপ্রাণী, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা
বিধানের বহুমাত্রিকতা ও চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় বন্যপ্রাণী, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ,
সুরক্ষা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা এবং বন্যপ্রাণীর সার্বিক কল্যাণ বিধানের নিমিত্ত নতুন
আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে যাহা ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক (Article 18A) একটি গুরুত্বপূর্ণ
সংযোজন, যা পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে।
যাহার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি গত ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখ অন্তর্বর্তী সরকারের অনুষ্ঠিত
উপদেষ্টা পরিষদের সভায় “বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ-২০২৫” ও “বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫” এর চূড়ান্ত এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন অধ্যাদেশে প্রাকৃতিক বন রক্ষা, বনভূমির সীমানা
ও রেকর্ড সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংয়ের
মাধ্যমে অবৈধ দখল প্রতিরোধ, অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধার, আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ এবং
কর্তনযোগ্য ও কর্তন–নিষিদ্ধ বৃক্ষের তালিকা হালনাগাদ করার মতো সময়োপযোগী বিধান অন্তর্ভুক্ত
হয়েছে। এটি দেশের বন ব্যবস্থাপনাকে প্রায় এক শতাব্দী পর আধুনিকায়নের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা
২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন
এবং বন সংরক্ষণে প্রায় ১০০ বছর ধরে কার্যকর The Forest Act, 1927 বাস্তবে অনেক
সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার সাথে অসামঞ্জস্যতার মুখে ছিল। মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে
জটিলতা, অপরাধ শনাক্তকরণে দুর্বলতা ও প্রজাতিভিত্তিক সুরক্ষায় অস্পষ্টতা থাকায় নতুন
করে প্রণয়ন করা হয়েছে “বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৫”।
নতুন অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, শিকার,
পাচার, হত্যা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় করা হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য
রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা, উদ্ধার–শুশ্রুষা–পুনর্বাসন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা
বৃদ্ধি এবং মানুষ–বন্যপ্রাণী সংঘাত প্রশমনে “বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড” প্রতিষ্ঠার
বিধান রাখা হয়েছে।
এ অধ্যাদেশের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হলো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে
বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণের
স্বীকৃতি, যা একটি সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকে শক্তিশালী
করে।
আইনের সারসক্ষেপ বিশ্লষণঃ
এই আইনটি “বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ,
২০২৫” হিসেবে ৫২টি ধারা ও ১০টি (দ্বাদশ) অধ্যায় ও ৪টি তফসিলে ১৫৯৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী
ও উদ্ভিদ সুরক্ষার বিষয় সংযোজিত হয়েছে। এবং ৬৪টি সংজ্ঞা ১ ধারায় ও ৪১ ধারায় অপরাধ ও
দন্ড সংক্রান্ত টেবিলযোগে ১৭টি ধারার অপরাধের শাস্তি ও দন্ডের বিধান উল্লেখ করা হযেছে
যাহাতে ৪০ ধারায় মিথ্যা অভিযোগ বা মামলা দায়েরের শাস্তির বিধানসহ সংযোজন করা হয়েছে।
৪৪ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাক্তি বা বণ কর্মকর্তা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে জুডিশিয়াল
বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিশেষ ম্যাজিস্টে কর্তৃক বিচার
কার্য পরিচালিত হবে। এবং বিচারিক পক্রিয়া ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কার্যবিধি আইন অনুযায়ী
পরিচালিত হবে। এছাড়াও ২য় অধ্যায়ে প্রসাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ৩য় অধ্যায়ে বন্যপ্রাণী
ও উদ্ভিদ রক্ষা, ৪র্থ অধ্যায়ে রক্ষিত এলাকা ঘোণষা ও ব্যবস্থাপনাসহ পর্যাক্রমে পারমিট,
লাইসেন্স, আমদানী ও রপ্তানী, বন্যপ্রাণী রক্ষা ইউনিট, জব্দ, অপরাধন দন্ড ও বিচার এবং
বিবিধ বিষয়াদি সংযোজিত হয়েছে।
তফসিলভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস: সুরক্ষার আওতায় ১,৫৯৯ প্রজাতি।
নতুন আইনে চারটি তফসিল থাকলেও তফসিল–১ কে আবার ক, খ
ও গ—এই তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।
- তফসিল–১(ক): সূচক প্রাণী (Flagship Species) - বাঘ ও হাতি
- তফসিল–১(খ): ২৫০ প্রজাতির বন্য প্রাণী
- তফসিল–১(গ): ১২৭ প্রজাতি
- তফসিল–২: আরও ১,২০৭ প্রজাতি
- তফসিল–৩: ১৫ প্রজাতির ইঁদুর, যেগুলো কৃষকেরা বিনা বাধায় তাড়াতে পারবেন
- তফসিল–৪: ১০০ প্রজাতির গাছ আইনি সুরক্ষার আওতায়
মোট ১,৫৯৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ নতুন আইনে সুরক্ষা পেয়েছে—যা বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ইতিহাসে এক বড় অগ্রগতি।
এ তালিকায় রয়েছে ১৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭৪১ প্রজাতির পাখি, ১৬০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬০ প্রজাতির উভচর, ৯১ প্রজাতির হাঙর ও শাপলা পাতা, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শসা, ৩২ প্রজাতির কোরাল, ৩৮ প্রজাতির শামুক–ঝিনুক, ১৮৮ প্রজাতির প্রজাপতি ও মথ, ২৪ প্রজাতির বিটলস এবং ১০০ প্রজাতির মূল্যবান উদ্ভিদ।
বন্যপ্রাণী হত্যার অপরাধ: কঠোর শাস্তির বিধান
২০১২ সালের আইনের ধারাবাহিকতায় বাঘ ও হাতি হত্যা
আগের মতোই আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বহাল রয়েছে।
বাঘ ও হাতি হত্যার শাস্তি ক্ষেত্রে প্রথমবার: কারাদণ্ড: ২–৭ বছর ও অর্থদণ্ড:
১–১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয়বার পূণরায় অপরাধ সংগঠিত হলে: কারাদণ্ড: সর্বোচ্চ
১২ বছর ও অর্থদণ্ড: সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা।
অন্যান্য বিপন্ন প্রাণী হত্যা যেমন- চিতা বাঘ, লাম চিতা, কুমির, ডলফিন, সাম্বার হরিণ,
তিমি, ঘড়িয়াল, উল্লুক ইত্যাদি প্রাণী হত্যার শাস্তি- প্রথমবার: সর্বোচ্চ ৩ বছর
বা ৩ লাখ টাকা জরিমানা ও দ্বিতীয়বার পূনরায় অপরাধ সংগঠিত হলে: সর্বোচ্চ
৫ বছর বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা।
ট্রফি (দেহাংশ) সংরক্ষণ যেমন- বাঘ ও হাতির ট্রফি বা দেহাংশ পারমিট ছাড়া সংরক্ষণ করলে- প্রথমবার: ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং পূনরায় দ্বিতীয়বার সংগঠিত হলে: ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা
নতুন কঠোরতা: আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপোষ অযোগ্য
অপরাধের বিস্তৃতি
আগে শুধু বাঘ ও হাতি হত্যাই জামিন অযোগ্য ছিল। নতুন অধ্যাদেশের ৪৬ ধারা অনুযায়ী তফসিল- ১ এর (ক) ও (খ) অংশে থাকা ২৫১টি প্রাণী হত্যার অপরাধ এখন জামিন অযোগ্য। এই সংশোধন বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় আইনি কঠোরতাকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে।
পরোয়ানাবিহীন গ্রেপ্তার ও মুক্তি প্রদানের ক্ষমতা
নতুন অধ্যাদেশের ৩৭ ধারা আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে
সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দিয়েছে বন কর্মকর্তাদের
ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তা ন্যূনতম—
- পুলিশ: উপপরিদর্শক (SI)
- কাস্টমস: সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা
- কোস্টগার্ড: পেটি অফিসার
- বিজিবি: হাবিলদার
- বন অধিদপ্তর: সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
মুক্তি সংক্রান্ত ক্ষমতার ক্ষেত্রে জামিনযোগ্য অপরাধে মুক্তির ক্ষমতা থাকবে বন অধিদপ্তরের সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তার হাতে। এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত কর্তৃক।
আইনি সংস্কারের পরও বাস্তবায়ন–চ্যালেঞ্জ
যদিও নতুন অধ্যাদেশে তফসিলভিত্তিক শাস্তি সুনির্দিষ্ট
করা হয়েছে এবং সংরক্ষণ কাঠামো আধুনিক করা হয়েছে, তবু বাস্তবায়ন হচ্ছে মূল চ্যালেঞ্জ।
যেমন- মাঠ পর্যায়ে বন কর্মকর্তাদের সক্ষমতা সীমিত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত
প্রশিক্ষণের অভাব, স্থানীয় শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব, অভিযানে পর্যাপ্ত প্রযুক্তি
ও সম্পদের অভাব, সরকারী ও বেসরকারী ভাবে সতর্কতা কর্মশালা ও সভা সেমিনারের আয়োজনের
অভাব ও গুরুত্বহীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব।
অতএব, সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে
আইনের বিস্তারিত বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা জরুরি।
সর্বপরি, সময়োপযোগী আইনি সংস্কার কেবল প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে না; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, সুশাসন, পরিবেশ সুরক্ষা ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিকেও দৃঢ় করে। নতুন বন ও বন্যপ্রাণী অধ্যাদেশ একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন বড় পরীক্ষা। আইন যতই আধুনিক হোক, প্রয়োগের দৃঢ়তা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হলে এ অধ্যাদেশ দেশের পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন হলো ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনস্বার্থ রক্ষার প্রধান ভিত্তি। সমাজ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিশ্বপরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় পুরোনো আইন অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বহু আইন এখনও ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগের কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, যা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। তাই সময়োপযোগী, বাস্তবায়নমুখী ও নাগরিকবান্ধব সংশোধন অপরিহার্য। অপ্রাসঙ্গিক বা পুরোনো আইন ন্যায়বিচার বিলম্বিত করে। আদালতে পেন্ডিং মামলা কমাতে ও বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়াতে সংশোধন প্রয়োজন।
বন সংরক্ষণে প্রায় ১০০ বছর ধরে কার্যকর The Forest
Act, 1927 বর্তমান পরিবেশগত বাস্তবতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আর পর্যাপ্ত
নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়নের চাপ, অবৈধ দখল, বনভূমি উচ্ছেদসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়
নতুন ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশে প্রাকৃতিক
বন রক্ষা, বনভূমির রেকর্ড ও সীমানা সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, উন্নত
প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ দখল প্রতিরোধ, অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধার, আগ্রাসী
প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্তনযোগ্য ও কর্তন নিষিদ্ধ বৃক্ষের তালিকা হালনাগাদের মতো বিধান
অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিবর্তনের কারণে নতুন ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণীত হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, শিকার, পাচার, হত্যা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় করা হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা, বন্যপ্রাণী উদ্ধার, শুশ্রুষা, পুনর্বাসন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষ-বন্যপ্রাণীর সুসমন্বিত সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষণ কার্যক্রমে বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বন আইনে প্রথাগত বনবাসীর অধিকারকে সংরক্ষণ ও স্বীকৃতি
দেওয়া হয়েছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও
নিরাপত্তা আইন-২০১২’ এর মতো অধ্যাদেশে চারটি তফসিল থাকলেও নতুন অধ্যাদেশে তসফিল–১ কে
ক, খ, গ এ তিন উপভাগে ভাগ করা হয়েছে। তফসিল–১ (ক) তে পরিবেশের সূচক (ফ্ল্যাগশিপ স্পেসিজ)
হিসেবে বাঘ ও হাতিকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তফসিল–১(খ)তে ২৫০ প্রজাতির বন্য প্রাণী সুরক্ষা
পাবে। তফসিল–১(গ) তে ১২৭টি ও তফসিল–২ এ ১ হাজার ২০৭টি প্রজাতির
বন্য প্রাণী সুরক্ষার আওতায় এসেছে। তফসিল–৩ আছে ১৫ প্রজাতির ইঁদুর, যেগুলো তাড়াতে পারবে
কৃষক। এসব ইঁদুর আইনে সুরক্ষা পাবে না। তফসিল–৪ এ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে ১০০ প্রজাতির
গাছকে।
অধ্যাদেশে ১৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭৪১ প্রজাতির পাখি, ১৬০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬০ প্রজাতির উভচর, হাঙর ও শাপলা পাতা ৯১ প্রজাতির, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া, সামুদ্রিক শসা ২৩ প্রজাতির, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাছ, ৩২ প্রজাতির কোরাল, ৩৮ প্রজাতির শামুক ও ঝিনুক, প্রজাপতি ও মথ ১৮৮ প্রজাতির, বিটলস ২৪ প্রজাতির ও ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদকে সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণী মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৫৯৯ প্রজাতি এ অধ্যাদেশে সুরক্ষার আওতায় এসেছে।
বন্য প্রাণী হত্যায় বিবরণ ও শাস্তিসমূহঃ
২০১২ সালের আইনের নবম অধ্যায়ের ৩৬ ধারায় বাঘ ও হাতি হত্যাকে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জামিন অযোগ্য করা হয়েছিল। এখনো তা–ই আছে। কেউ লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া প্রথমবার বাঘ ও হাতি হত্যা করলে সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার এবং একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে অপরাধীর সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ অর্থদণ্ড দেওয়ার আগের বিধান বহাল রাখা হয়েছে নতুন অধ্যাদেশে।
আগের আইনের ধারা–৩৭–এ বলা ছিল, চিতা বাঘ, লাম চিতা,
কুমির, ডলফিন, সাম্বার হরিণ, তিমি, ঘড়িয়াল, উল্লুক হত্যা করলে শাস্তি নির্ধারণ আছে
সর্বোচ্চ ৩ বছর জেল অথবা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয়বার একই
অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল অথবা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। নতুন
অধ্যাদেশেও তা বহাল রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া পারমিট না নিয়ে বাঘ ও হাতির ট্রফি (দেহাংশ) সংরক্ষণ করলে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান আগের আইনের মতোই থাকছে।
তবে আগের আইনের ৪৩ ধারায় বাঘ ও হাতি হত্যাকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করলেও অন্যান্য প্রাণী হত্যাকে আমল অযোগ্য ও জামিনযোগ্য ছিল। নতুন অধ্যাদেশের ৪৬ ধারায় তফসিল–১–এর ক ও খ তে থাকা বন্য প্রাণী হত্যাকে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এটাকে জামিনঅযোগ্য করা হয়েছে। ফলে ক তফসিলে থাকা বাঘ, হাতির সঙ্গে এখন ২৫০টি প্রাণী যোগ হচ্ছে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে।
পরোয়ানা ব্যাতিত গ্রেপ্তার ও মুক্তি প্রদানের ক্ষমতাঃ
নতুন অধ্যাদেশের ৩৭ ধারায় আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে
সন্দেহভাজন বন অপরাধীকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বন কর্মকর্তা
ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
সে ক্ষেত্রে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, পুলিশের ক্ষেত্রে
সর্বনিম্ন উপপরিদর্শক, কাস্টমসের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা, কোস্টগার্ডের
ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পেটি অফিসার, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন হাবিলদার
পদমর্যাদার কর্মকর্তা হতে হবে। জামিনযোগ্য ধারায় কেউ অপরাধ করলে তাকে বন অধিদপ্তরের
সর্বনিম্ন সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মুচলেকার ভিত্তিতে মুক্তি দিতে পারবেন।
উপসংহারঃ
সমসাময়িক আইন প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত
করে। পরিবেশ ও মানবাধিকারবান্ধব আইন প্রণয়ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান
সুদৃঢ় করবে। যখন আইন স্পষ্ট ও বাস্তবায়নমুখী হবে, তখন জনআস্থা বাড়বে এবং উন্নয়ন টেকসই
হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন, সুশাসন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে আইনসমূহ
সময়ের সঙ্গে হালনাগাদ করা অপরিহার্য। যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন ও দৃঢ় বাস্তবায়ন সমাজে ন্যায়,
সমতা, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন সৃষ্টির পথ তৈরি করবে। সঠিক সংশোধন শুধু প্রশাসনিক কাঠামোকেই
শক্তিশালী করে না, বরং নাগরিকের জীবনমান উন্নত করে একটি আধুনিক, দায়িত্বশীল ও প্রগতিশীল
রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করে।
পূর্বের আইনে তফসিলভিত্তিক শাস্তি সুনির্দিষ্ট ছিল না,
নতুন অধ্যাদেশে তফসিলভিত্তিক অপরাধের শাস্তি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। অন্যান্য এলাকাভিত্তিক
কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশটি বেশ কিছু বিষয়কে ইতিবাচক পরিবর্তন
এসেছে, কিন্তু বাস্তবায়নটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীকে এ আইন সম্পর্কে বিশদভাবে অবহিত করতে হবে, যাতে তাঁরা আইনটির যথাযথ
প্রয়োগ ঘটাতে পারেন। তাহলে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে একটা দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে। এবং পরিবেশ
সুরক্ষায় আধুনিক আইন হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

No comments