লাইলাতুল কদর: শানে নুযূল, গুরুত্ব, তাৎপর্য ও করণীয়

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই পবিত্র মাসের মধ্যেই রয়েছে এক মহিমান্বিত রাত—লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তা’আলা এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম ঘোষণা করেছেন। এই রাতে ইবাদত করলে মানুষের জীবনের বহু গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায় এবং মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভ করা যায়।

লাইলাতুল কদর: শানে নুযূল, গুরুত্ব, তাৎপর্য ও করণীয়


লাইলাতুল কদর কী?


লাইলাতুল কদর আরবি শব্দ।

লাইলাত অর্থ রাত

কদর অর্থ মর্যাদা, সম্মান বা ভাগ্য নির্ধারণ

অর্থাৎ লাইলাতুল কদর হলো মর্যাদাপূর্ণ, সম্মানিত ও ভাগ্য নির্ধারণের রাত।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন—

“নিশ্চয়ই আমি এই কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে।


আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী?


লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”

— (সূরা আল-কদর ৯৭:১–৩)

লাইলাতুল কদরের শানে নুযূল

তাফসীরবিদদের মতে, নবী ﷺ এর সাহাবিদের কাছে পূর্ববর্তী উম্মতদের দীর্ঘ ইবাদতের কথা উল্লেখ করা হলে তারা দুঃখ প্রকাশ করেন যে, তাদের আয়ু তুলনামূলক কম। তখন আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মতের জন্য বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে লাইলাতুল কদর প্রদান করেন, যাতে একটি রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের সমান সওয়াব লাভ করা যায়।

এই রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়েও আল্লাহ তাআলা বলেন—

“নিশ্চয়ই আমি তা নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে।”

— (সূরা আদ-দুখান ৪৪:৩)


লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব


১. হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রাত

“লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”

— (সূরা আল-কদর ৯৭:৩)

২. ফেরেশতাদের অবতরণ

এই রাতে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন।

“সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাইল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিতে অবতরণ করেন।”

— (সূরা আল-কদর ৯৭:৪)

৩. শান্তি ও বরকতের রাত

“সে রাত ফজর হওয়া পর্যন্ত শান্তিময়।”

— (সূরা আল-কদর ৯৭:৫)

৪. গুনাহ মাফের সুযোগ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।”

— (সহিহ বুখারি: ২০১৪, সহিহ মুসলিম)


লাইলাতুল কদরের সময়


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।”

— (সহিহ বুখারি: ২০১৭)

অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।


লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য


১. এই রাতে আল্লাহ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন।

২. এটি রহমত ও মাগফিরাতের বিশেষ সময়।

৩. অল্প সময়ের ইবাদতে অসীম সওয়াব অর্জনের সুযোগ।

৪. আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ।


লাইলাতুল কদরে করণীয় ইবাদত


১. নফল সালাত ও তাহাজ্জুদ আদায়

রাসূল ﷺ শেষ দশকে বেশি বেশি ইবাদত করতেন।

“রাসূলুল্লাহ ﷺ রমজানের শেষ দশকে ইবাদতে অধিক পরিশ্রম করতেন।”

— (সহিহ মুসলিম: ১১৭৫)

২. কুরআন তিলাওয়াত

এই রাতে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

৩. বেশি বেশি দোয়া করা

হযরত আয়েশা (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন—

“হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি লাইলাতুল কদর পাই, তাহলে কী দোয়া করব?”

রাসূল ﷺ বললেন—

“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।”

অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।”

— (তিরমিজি: ৩৫১৩)

৪. জিকির ও ইস্তিগফার

আল্লাহর স্মরণ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।

৫. দান-সদকা করা

এই রাতে দান-সদকা করলে বহু গুণ সওয়াব পাওয়া যায়।


উপসংহার

লাইলাতুল কদর আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম উম্মতের জন্য এক মহান নিয়ামত। এই রাতের মর্যাদা ও ফজিলত অসীম। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত রমজানের শেষ দশকে বিশেষভাবে ইবাদত-বন্দেগি, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও নফল সালাতে সময় কাটানো। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের বরকত ও রহমত লাভ করার তাওফিক দান করেন।


লাইলাতুল কদর: শানে নুযূল, গুরুত্ব, তাৎপর্য ও করণীয়

(কোরআন ও হাদিসের আলোকে একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ)

অ্যাডভোকেট আবদুর রব পারভেজ রবি

No comments

Powered by Blogger.