সুগৌলি চুক্তি, কালী নদী ও লিম্পিয়াধুরা-কালাপানি-লিপুলেখ: দুই শতাব্দীর সীমান্ত-বিতর্কের আইনগত ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ;

 

সুগৌলি চুক্তি, কালী নদী ও লিম্পিয়াধুরা-কালাপানি-লিপুলেখ: দুই শতাব্দীর সীমান্ত-বিতর্কের আইনগত ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ; লেখক: আবদুর রব পারভেজ রবি আইনজীবী ও আইন বিশ্লেষক।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত ও নেপালের মধ্যকার সীমান্ত সম্পর্ক সাধারণত বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও একটি সীমান্ত প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয় হয়ে আছে। সেই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো লিম্পিয়াধুরা (Limpiyadhura), কালাপানি (Kalapani) ও লিপুলেখ (Lipulekh) অঞ্চল। এই বিরোধের ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজতে গেলে প্রায় দুই শতাব্দী পেছনে ফিরে যেতে হয় ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি (Treaty of Sugauli)-তে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অনেক সময় ভুলভাবে এই চুক্তিকে “১৮৮৬ সালের সুগৌলি চুক্তি” বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে চুক্তিটি ২ ডিসেম্বর ১৮১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় এবং ৪ মার্চ ১৮১৬ সালে নেপালের রাজা ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে অনুমোদিত হয়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে এর বয়স প্রায় ২১০ বছর।

চুক্তিটি ছিল অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার দলিল। এর মাধ্যমে নেপাল তার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের একটি অংশ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে এবং পশ্চিম দিকে কালী নদীকে সীমান্ত-নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু চুক্তিতে কালী নদীর সুনির্দিষ্ট উৎসস্থল স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। পরবর্তীকালে বিভিন্ন মানচিত্র, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নদীর শাখা-উপশাখা এবং ঐতিহাসিক দলিলের ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকেই বর্তমান সীমান্ত-বিরোধের জন্ম।

সুগৌলি চুক্তির ঐতিহাসিক পটভূমি

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে নেপালের গোর্খা রাজ্য দ্রুত তার ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করছিল। অপরদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করছিল। দুই শক্তির ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ফলে সীমান্তে সংঘাত বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নেপালের রাজ্যের মধ্যে সুগৌলি চুক্তি সম্পাদিত হয়। মূল চুক্তিতে নয়টি Article ছিল। এর মাধ্যমে শান্তি ও বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা, ভূখণ্ড হস্তান্তর, সীমান্ত নির্ধারণ এবং দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।

চুক্তির Article III-তে নেপাল কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বিভিন্ন ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে কালী ও রাপ্তি নদীর মধ্যবর্তী নিম্নভূমি এবং অন্যান্য অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল। Article V-তে পশ্চিম সীমান্তের জন্য কালী নদীকে কেন্দ্রীয় ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

Article V-এর আইনগত গুরুত্ব

সুগৌলি চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলোর একটি হলো Article V। এতে নেপালের রাজা, তাঁর উত্তরাধিকারী ও উত্তরসূরিদের পক্ষ থেকে কালী নদীর পশ্চিমে অবস্থিত দেশসমূহের ওপর দাবি বা সম্পর্ক ত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ চুক্তির ভাষা থেকে একটি মৌলিক বিষয় পাওয়া যায় কালী নদী ছিল নেপালের পশ্চিম সীমান্ত নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ reference point। কিন্তু সমস্যা হলো, চুক্তিটি কালী নদীর কোন উৎসকে “Kali River” হিসেবে গ্রহণ করেছে, তা বিস্তারিত ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক বা আধুনিক survey coordinate দিয়ে নির্ধারণ করেনি। ফলে প্রায় দুই শতাব্দী পরে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: কালী নদীর প্রকৃত উৎস কোনটি?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে সীমান্তরেখা কোথায় হবে।

বিরোধের মূল কেন্দ্র: কালী নদীর উৎস

নেপালের অবস্থান হলো, বর্তমান লিম্পিয়াধুরা অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদীই কালী বা মহাকালী নদীর প্রধান উৎস। সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে নদীর পূর্বদিকে লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ অবস্থিত এবং সেগুলো নেপালের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত এমন দাবি নেপাল করে।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালেও এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। মে ২০২৬-এর এক সরকারি বিবৃতিতে নেপাল বলেছে যে ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি অনুসারে মহাকালী নদীর পূর্বে অবস্থিত লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি নেপালের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড। নেপাল একই সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি, মানচিত্র, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কূটনৈতিকভাবে বিরোধ সমাধানের কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে ভারত এই ভূখণ্ডকে নিজেদের বলে দাবি করে এবং সীমান্ত প্রশ্নটি দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রে শুধু একটি নদী নয়; বরং নদীর উৎস নির্ধারণ, পুরোনো মানচিত্রের ব্যাখ্যা, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উপস্থিতি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।

লিম্পিয়াধুরা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

লিম্পিয়াধুরা হলো বর্তমান বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক বিন্দু। নেপালের দাবি অনুযায়ী, কালী নদীর প্রকৃত উৎস লিম্পিয়াধুরা অঞ্চলে। যদি এই উৎসকে সীমান্তের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে সীমান্তরেখা এমনভাবে অঙ্কিত হবে যার ফলে কালাপানি ও লিপুলেখসহ বিস্তৃত একটি অঞ্চল নেপালের পূর্বদিকে পড়ে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক মানচিত্রের গবেষণায় কালী নদীর উৎস ও গতিপথ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। একটি গবেষণায় ১৮১৬ থেকে ১৮৮০-এর দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন Survey map পর্যালোচনা করে দাবি করা হয়েছে যে কিছু পুরোনো মানচিত্রে কালী নদীর উৎস লিম্পিয়াধুরার দিকে দেখানো হয়েছিল। তবে এই মানচিত্রগুলোর ব্যাখ্যা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

অতএব, শুধু একটি মানচিত্র দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রশ্ন চূড়ান্ত করা আইনগতভাবে সহজ নয়। কোন মানচিত্র কখন তৈরি হয়েছিল, কে তৈরি করেছিল, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র তা গ্রহণ করেছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিকভাবে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল—এসব প্রশ্নও বিবেচ্য।

কালাপানি: মানচিত্র বনাম কার্যকর নিয়ন্ত্রণ

কালাপানি অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারত, নেপাল ও তিব্বত/চীনের সংযোগস্থলের নিকটবর্তী পার্বত্য এলাকা। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের অবস্থান ও নদীর উৎস নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত-বিরোধের ক্ষেত্রে শুধু কোনো একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং treaty interpretation, subsequent practice, maps, administrative control, acquiescence এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক evidence বিবেচনা করা হয়। তাই ১৮১৬ সালের চুক্তি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর প্রয়োগের জন্য পরবর্তী দুই শতাব্দীর রাষ্ট্রীয় আচরণ ও দলিলও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এখানেই “চুক্তি কী বলেছে” এবং “চুক্তির পর দুই রাষ্ট্র বাস্তবে কী করেছে” এই দুই প্রশ্নের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়।

লিপুলেখ ও বর্তমান বিরোধ

লিপুলেখ পাস ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্বতপথ। ভারত ও চীনের মধ্যে তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।

২০২০ সালের মে মাসে ভারত লিপুলেখের দিকে একটি সড়ক সংযোগ উদ্বোধন করলে নেপাল তীব্র আপত্তি জানায়। নেপাল দাবি করে, ওই সড়ক নেপালের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গেছে এবং সুগৌলি চুক্তি অনুযায়ী লিপুলেখ নেপালের অংশ। নেপালের সরকারি নথিতে এই অবস্থান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর ২০ মে ২০২০ নেপাল নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখকে নেপালের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়।

২০২০ সালের নতুন মানচিত্রের তাৎপর্য

নেপালের নতুন মানচিত্র প্রকাশ কেবল একটি cartographic exercise ছিল না; এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের একটি আনুষ্ঠানিক দাবি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে নেপালের সংবিধানেও সংশ্লিষ্ট সরকারি মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০২৫ সালের আগস্টেও নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুনরায় জানায় যে নেপালের সরকারি মানচিত্রে মহাকালী নদীর পূর্বের লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি নেপালের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে।

তবে কোনো রাষ্ট্রের একতরফা মানচিত্র প্রকাশ নিজে থেকেই আন্তর্জাতিক সীমান্তের আইনগত নিষ্পত্তি ঘটায় না। সীমান্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, ঐতিহাসিক evidence, পারস্পরিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্রীয় practice এবং প্রয়োজনে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৫-২০২৬: বিরোধ কি আরও গভীর হয়েছে?

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখায় যে বিরোধটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারত ও নেপালের Boundary Working Group (BWG) এর সপ্তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সীমান্ত-স্তম্ভের পরিদর্শন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং survey ও mapping-এ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। তবে কালাপানি-সংক্রান্ত মূল বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এই প্রক্রিয়ায় হয়নি।

একই সময়ে ভারত-নেপাল Home Secretary Level Talks ও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত-স্তম্ভ, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

২০২৬ সালেও বিরোধের কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। নেপালের প্রধানমন্ত্রী সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করে জানান যে ভারত ও নেপালের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চলছে। ভারতও তৃতীয় পক্ষের পরিবর্তে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি

সুগৌলি চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক boundary treaty হিসেবে দেখলে কয়েকটি আইনগত প্রশ্ন সামনে আসে।

প্রথমত, চুক্তির পাঠ (text) কী বলে? Article V কালী নদীর পশ্চিমের ভূখণ্ড সম্পর্কে নেপালের দাবি ত্যাগের কথা বলে। সুতরাং কালী নদীর সঠিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, চুক্তির উদ্দেশ্য (object and purpose) কী ছিল? যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি ও ভূখণ্ডের সীমারেখা স্থির করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

তৃতীয়ত, পরবর্তী রাষ্ট্রীয় আচরণ (subsequent practice) কী? দুই শতাব্দী ধরে ভারতীয় ও নেপালি প্রশাসন কোন কোন অঞ্চলে কার্যকর প্রশাসন পরিচালনা করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ evidence হতে পারে।

চতুর্থত, ঐতিহাসিক মানচিত্র কী দেখায়? কোন সময়ের Survey map কীভাবে কালী নদীকে চিহ্নিত করেছে, তা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

পঞ্চমত, নদীর উৎসের বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক নির্ধারণ কী বলে? নদীর প্রধান উৎস এবং উপনদীর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব, “কালী নদীর পূর্বে যা কিছু আছে সবই নেপালের” এমন সরলীকৃত বক্তব্যের পরিবর্তে বলা অধিক আইনসম্মত যে কালী নদীর সীমান্ত-রূপ নির্ধারণ এবং তার ঐতিহাসিক উৎসের প্রমাণই বিরোধের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন

নেপালের দাবির আইনগত ভিত্তি

নেপালের দাবির প্রধান ভিত্তি হলো সুগৌলি চুক্তির Article V এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক মানচিত্র ও দলিল। নেপালের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, কালী নদীর পূর্বের ভূখণ্ড নেপালের এবং লিম্পিয়াধুরা থেকেই কালী নদীর উৎস বিবেচনা করা উচিত।

এই যুক্তির শক্তি হলো চুক্তির একটি express geographical reference রয়েছে এবং সেই reference-এর ভিত্তিতে সীমান্ত নির্ধারণের চেষ্টা করা যায়।

ভারতের অবস্থানের আইনগত গুরুত্ব

ভারতের অবস্থানকে কেবল “চুক্তি অস্বীকার” হিসেবে দেখা যথাযথ নয়। প্রকৃত বিতর্কের একটি বড় অংশ হলো কালী নদীর উৎস কোথায় এবং ঐতিহাসিকভাবে কোন নদীকে সীমান্ত-নির্ধারক কালী নদী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

ভারত-নেপাল সীমান্তের অধিকাংশ অংশে boundary demarcation অগ্রসর হলেও কালাপানি ও সাস্তা (Susta) দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। ২০২৫ সালের Boundary Working Group বৈঠকেও দুই দেশ সীমান্তের অন্যান্য technical কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়, কিন্তু এই disputed areas আলাদা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে।

২০০ বছরের শিক্ষা

সুগৌলি চুক্তি থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো একটি সীমান্ত চুক্তিতে শুধু নদী বা পাহাড়ের নাম উল্লেখ করা যথেষ্ট নয়। আধুনিক আন্তর্জাতিক সীমান্ত নির্ধারণে নির্ভুল coordinate, map reference, watershed description, survey methodology এবং demarcation mechanism থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৮১৬ সালে আধুনিক GPS, satellite imagery বা digital cartography ছিল না। ফলে “River Kali” শব্দটি ব্যবহার করা হলেও তার উৎস ও গতিপথের সুনির্দিষ্ট coordinate নির্ধারণ করা হয়নি। দুই শতাব্দী পরে সেই অস্পষ্টতা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে।

সমাধানের সম্ভাব্য পথ

এই বিরোধের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হলো দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ও কারিগরি আলোচনা। প্রথমে উভয় দেশের ঐতিহাসিক মানচিত্র, survey record, treaty document, administrative records এবং নদীবিদ্যার তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

এরপর যৌথ survey team গঠন করে কালী নদীর উৎস ও সংশ্লিষ্ট watershed বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। GPS, satellite imagery এবং historical cartography একত্রে ব্যবহার করলে বিতর্কের factual foundation আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তারপর দুই দেশ একটি mutually acceptable boundary line নির্ধারণ করতে পারে। প্রয়োজনে historical treaty-এর interpretation নিয়ে expert-level discussion এবং foreign-secretary-level negotiation হতে পারে।

২০২৫ সালের Boundary Working Group বৈঠকে আধুনিক survey ও mapping technology ব্যবহারের বিষয়ে যে সমঝোতা হয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

সুগৌলি চুক্তির প্রধান বিষয়বস্তু সমুহ ৯টি ধারার আলোকে

ধারা ১: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্থায়ী শান্তি ও বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। ধারা ২: যুদ্ধের পূর্বে বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডের ওপর নেপালের দাবি পরিত্যাগ এবং সেসব ভূখণ্ডে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয়। ধারা ৩: কালী–রাপ্তি, রাপ্তি–গণ্ডক, গণ্ডক–কোশী এবং মেচি–তিস্তা নদীর মধ্যবর্তী বিভিন্ন নিম্নভূমিসহ নির্দিষ্ট পাহাড়ি অঞ্চল স্থায়ীভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ধারা ৪: ভূখণ্ড হস্তান্তরের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালি প্রধান ও বরাহদারদের জন্য বছরে মোট দুই লাখ রুপি পর্যন্ত পেনশনের ব্যবস্থা করা হয়। ধারা ৫: নেপালের রাজা, তাঁর উত্তরাধিকারী ও উত্তরসূরিরা কালী নদীর পশ্চিমে অবস্থিত ভূখণ্ডের ওপর সকল দাবি ও সম্পর্ক পরিত্যাগ করেনবর্তমান লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ বিরোধে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা। ধারা ৬: নেপাল সিকিমের ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ করবে না এবং নেপাল–সিকিম বিরোধ হলে ব্রিটিশ সরকারের সালিশ মেনে নেবে। ধারা ৭: ব্রিটিশ সরকারের সম্মতি ছাড়া নেপাল কোনো ব্রিটিশ, ইউরোপীয় বা আমেরিকান নাগরিককে নিজস্ব চাকরিতে নিয়োগ বা বহাল রাখতে পারবে না। ধারা ৮: দুই রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একে অপরের দরবারে স্বীকৃত কূটনৈতিক প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ধারা ৯: চুক্তিটি নেপালের রাজা ১৫ দিনের মধ্যে এবং গভর্নর-জেনারেল ২০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করবেন এমন ratification-এর বিধান করা হয়। চুক্তিটি ২ ডিসেম্বর ১৮১৫ সালে স্বাক্ষরিত এবং ৪ মার্চ ১৮১৬ সালে অনুমোদিত হয়।

উপসংহার

সুগৌলি চুক্তি ভারত-নেপাল সীমান্ত ইতিহাসের একটি মৌলিক দলিল। এটি কোনো ১৮৮৬ সালের চুক্তি নয়; বরং ১৮১৫ সালে স্বাক্ষরিত এবং ১৮১৬ সালে অনুমোদিত একটি ঐতিহাসিক শান্তি ও সীমান্ত-চুক্তি। এর Article V কালী নদীর পশ্চিমে নেপালের দাবির অবসান ঘটানোর কথা বলেছে। কিন্তু চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো কালী নদীর নির্দিষ্ট উৎস ও সুনির্দিষ্ট সীমারেখা আধুনিক জরিপের ভাষায় নির্ধারিত হয়নি।

সেই ঐতিহাসিক অস্পষ্টতার ওপর ভিত্তি করেই আজ লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ প্রশ্নটি ভারত ও নেপালের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্র হয়ে আছে। নেপাল সুগৌলি চুক্তি, ঐতিহাসিক মানচিত্র ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ভূখণ্ডগুলোর ওপর দাবি করছে; ভারতও নিজস্ব ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক অবস্থানের ভিত্তিতে দাবি বজায় রেখেছে।

দুই শতাব্দী আগে যে চুক্তি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল, তার একটি ভৌগোলিক অস্পষ্টতা আজও দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের মূল চেতনা হলো বিরোধকে শক্তি দিয়ে নয়, প্রমাণ, চুক্তি, পারস্পরিক সম্মতি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। ভারত ও নেপালের দীর্ঘ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জনগণ-পর্যায়ের সম্পর্ক বিবেচনায় কালাপানি-লিপুলেখ-লিম্পিয়াধুরা বিরোধেরও শেষ পর্যন্ত একটি পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পথ।

লেখক:
আবদুর রব পারভেজ রবি
আইনজীবী ও আইন বিশ্লেষক

No comments

Powered by Blogger.